logo

মাধ্যমিকে বাদ যাচ্ছে বিভাগ পদ্ধতি!

নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসা বিভাগ উঠে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা পছন্দ অনুযায়ী তার বিষয় নির্ধারণ করতে পারবে। ফলাফল ও মূল্যায়নে সমতা আনতে তিনটি গুচ্ছ ভিত্তিতে সব বিষয় ভাগ করা হবে। এতে একজন শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তরে সব বিষয়ে জ্ঞান লাভ করবে। তবে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে গিয়ে আবার বিভাগ পছন্দ করতে পারবে তারা। শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের নিয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশের আলোকে এসব সিদ্ধান্ত আগামী ২০২৪ সাল থেকে বাস্তবায়ন করতে চায় সরকার। যুক্তরাষ্ট্রে এ পদ্ধতি চালু আছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, শুধু বিভাগ নয়, পাবলিক পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে এনে শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়নের পরিমাণ বাড়ানো হবে। এ লক্ষ্যে অনেক কাজ এগিয়ে এনেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কারিকুলামের ব্যাপক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে কাজ করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্মকর্তারা গত দুই মাস ধরে পর্যায়ক্রমে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কর্মশালা করছে। সবার মতামতের ভিত্তিতে নতুন কারিকুলামের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে শিক্ষার্থীদের উৎপাদনমুখী ও বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে এ উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। এর আগে দেশের ১৮ জেলার ৮৬ শিক্ষকের মতামত, ১১টি সভা, ৬টি কনফারেন্স, দুটি স্কুলের ১০০ শিক্ষার্থীর সঙ্গে ফোকাস গ্রম্নপ ডিসকাশন (এফডিজি), ২১ জন কারিকুলাম বিশেষজ্ঞের মতামতের আলোকে শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা কমিটি সুপারিশ দিয়েছে। এ সুপারিশের ভিত্তিতে নতুন কারিকুলাম তৈরি করতে কাজ করছে এনসিটিবি।

এনসিটিবির বিশেষজ্ঞরা বলেন, দেশের হাইস্কুলগুলোতে পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি সুবিধা নেই। সরকারি হাইস্কুলে প্র্যাকটিক্যাল করানোর মতো পর্যাপ্ত ল্যাব বা সহকারী নেই। এরপরও বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা ১০০ নম্বর ব্যবহারিকের মধ্যে প্রায় শতভাগ নম্বর পেয়ে যায়। এতে মানবিক ও ব্যবসা শাখার শিক্ষার্থীরা ফলাফলে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

যেভাবে বাস্তবায়ন হবে এ পদ্ধতি

শিক্ষার মানোন্নয়নে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদদের নিয়ে ২০১৬ সালে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সদস্যদের নিয়ে ওই বছরের ২৫ ও ২৬ নভেম্বর কক্সবাজারে দুদিনের আবাসিক কর্মশালা হয়। এতে শিক্ষাবিদরা বেশকিছু সুপারিশ করেন। সুপারিশ বাস্তবায়নে কয়েকটি সাব-কমিটিও গঠন করা হয়। শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা সাব-কমিটি ২০১৭ সালের ৩০ নভেম্বর ৮ দফা সুপারিশ প্রস্তাব করেন। সেখানে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণির শিক্ষাক্রম বিষয়বস্তুর গুরুত্ব অনুসারে তিন গুচ্ছে ভাগ করার পরামর্শ দেন। `ক` গুচ্ছে বাংলা, ইংরেজি ও গণিত। ‘খ’ গুচ্ছে বিজ্ঞান, সমাজ পাঠ (ইতিহাস পৌরনীতি ও ভূগোল)। ‘ক’ ও ‘খ’ গুচ্ছ বাধ্যতামূলক। আর ‘গ’ গুচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি, চারু-কারুকলা, শরীরচর্চা ও খেলাখুলা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, কৃষি ও গার্হস্থ্য, নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি। এছাড়া ‘ঘ’ গুচ্ছে প্রকৌশল প্রযুক্তি (বিদু্যৎ, যন্ত্র, কাঠ, ধাতু ইত্যাদির ব্যবহারিক জ্ঞান ও প্রয়োগ) যুক্ত করার মত দেন শিক্ষাবিদরা। শিক্ষাবিদরা ‘গ’ গুচ্ছের বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা না নিয়ে স্কুলে ধারাবাহিক মূল্যায়ন ও এর সঙ্গে যুক্ত সুচিন্তিত সহশিক্ষা ক্রমিক কার্যাবলির নিবিড় যোগ স্থাপন করবে বলে মত দেন। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে শিক্ষকদের ধারণা দিতে নির্দেশিকা তৈরি ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করার সুপারিশ করেন। ভবিষ্যতের কর্ম ও পেশা নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে ৯ম ও ১০ম শ্রেণিতে আগের শ্রেণির গুচ্ছের সঙ্গে ‘ঘ’ গুচ্ছ যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এগুচ্ছে রয়েছে পদার্থ, রসায়ন, জৈববিজ্ঞান, উচ্চতর গণিত, হিসাব, বিপণন, ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতি। ‘ঘ’ গুচ্ছ থেকে যেকোনো দুটি বিষয় শিক্ষার্থীরা নিতে পারবে। শিক্ষার্থীরা ইচ্ছা করলে ‘ঘ’ গুচ্ছ থেকে ঐচ্ছিকভাবে আরো একটি বিষয় নিতে পারবে। তবে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষাবিদরা ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণিতে পাঁচটি বিষয় বাধ্যতামূলক ও দুটি ঐচ্ছিক বিষয় প্রস্তাব দিয়েছেন। ধর্ম বিষয়ে পাবলিক পরীক্ষা না নিলে একটি বিশেষ শ্রেণি ক্ষুব্ধ হতে পারে। সে বিবেচনায় ধর্ম ও তথ্যপ্রযুক্তি বাধ্যতামূলক বিষয় করার মত দিয়েছেন। এক্ষেত্রে ঐচ্ছিক বিষয় একটি কমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নবম-দশম শ্রেণিতে পাঁচটি বাধ্যতামূলক বিষয় ছাড়া ‘গ’ গুচ্ছ থেকে দুটি ও ‘ঘ’ গুচ্ছ থেকে দুটি বা তিনটি বিষয় নিতে হবে। ফলে এসএসসি পরীক্ষায় ১৪টি থেকে চারটি বিষয় কমবে। অর্থাৎ ঐচ্ছিক বিষয়সহ মোট ১০টি বিষয়ে পরীক্ষা হবে।

কমিটির ৮ম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় চারু-কারুকলা, ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা, কৃষি, গার্হস্থ্য বিজ্ঞান, শরীরচর্চা ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়গুলো শ্রেণিকক্ষে মূল্যায়নের সুপারিশ করেন। এছাড়া ৩০০ নম্বরের পরীক্ষা কমানোর সুপারিশ করেন তারা। তাদের সুপারিশ অনুযায়ী ২০১৮ সাল থেকে ৪র্থ বিষয়ের (গার্হস্থ্য অর্থনীতি/কৃষি) পরীক্ষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিকভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। আগে জেএসসি-জেডিসি পরীক্ষায় বাংলা ও ইংরেজি- এ দুটি বিষয়ে ১৫০ করে মোট ৩০০ নম্বরের পরীক্ষা হতো। শিক্ষাবিদদের সুপারিশে ২০১৮ সাল থেকে বাংলা ও ইংরেজি বিষয়ে ১০০ নম্বর করে পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। এতে ২০০ নম্বরের পরীক্ষা কমে গেছে। কমিটির আগের সুপারিশে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালে ৮ম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় ১৩টি বিষয় থেকে ৩টি বিষয় পরীক্ষা কমিয়ে ফেলে। ২০১৭ সালের ৮ম শ্রেণির সমাপনী পরীক্ষায় শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, কর্ম ও জীবনমুখী শিক্ষা এবং চারু-কারুকলা বিষয়ে পরীক্ষা হয়নি। এসব বিষয়ে বিদ্যালয়ে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হয়েছে। আর এসএসসিতে শারীরিক শিক্ষা ও ক্যারিয়ার শিক্ষা বিষয়ের পরীক্ষা বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০১৮ সালের এসএসসি পরীক্ষায় এ দুই বিষয়ে পরীক্ষা বাদ দেওয়া হয়েছে। শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়ন করা হচ্ছে। মূল্যায়নের নম্বর সংশ্লিষ্ট শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হয়। মূল মার্কশিটে এসব বিষয়ের প্রাপ্ত নম্বর উলেস্নখ থাকছে। তবে পরীক্ষার ফলে কোনো প্রভাব পড়ছে না।

এ প্রসঙ্গে এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) প্রফেসর ড. মশিউজ্জামান বলেন, নতুন কারিকুলাম নিয়ে কাজ চলছে। কারিকুলামে ব্যাপক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে শিক্ষাবিদসহ সংশ্লিষ্টদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে একটি কর্মশালা চলছে। সবই প্রাথমিক পর্যায়ে আছে, এখনই চূড়ান্ত কিছু বলার সময় আসেনি।

শিক্ষাবিদরা জানান, অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিকে এক বিভাগ থেকে পাস করে উচ্চশিক্ষায় অন্য বিষয় নেয়। শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ নিয়ে পাস করে উচ্চ মাধ্যমিকে অন্য বিভাগে ভর্তি হয়। তারা বিভাগ নির্বাচনে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বা কখনও চাপিয়ে দেওয়া হয়। গুচ্ছভিত্তিক পদ্ধতি চালু করা হলে এ সমস্যা থাকবে না। গুচ্ছ পদ্ধতিতে সব শিক্ষার্থী বিজ্ঞান, ভূগোল ও ইতিহাস বিষয়ে জ্ঞানার্জন করতে পারবে। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে গিয়ে শিক্ষার্থীরা বিভাগ পছন্দ করে ভর্তি হবে। যুক্তরাষ্ট্রে এ পদ্ধতি চালু আছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

তবে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকদের দাবি, বিভাগ তুলে দিয়ে গুচ্ছ পদ্ধতি চালু করলে বিজ্ঞান বিষয়ের গুণগত মান কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। নবম শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকলে উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে শিক্ষার্থীরা সিলেবাসের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে না। কারণ বর্তমানে ৯ম-১০ম শ্রেণির বিজ্ঞান বিষয়ের বইগুলোয় যেসব কনটেন্ট আছে, তা মানসম্মত নয়। এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সঙ্গতি রেখেই নতুন কারিকুলাম চূড়ান্ত করা হবে।

Share Button

Comments are closed.







প্রধান সম্পাদক : ফজলুল হক জোয়ারদার আলমগীর, সহ-সম্পাদক : দেলোয়ার হোসেন শরীফ।
বার্তা সম্পাদক - মাসুম পাঠান, আমিন প্লাজা, ৩য় তলা, নয়াপল্টন, ঢাকা- বাংলাদেশ।
ফোন : ০১৭১১-১৮৯৭৬১, ০১৭১১-৩২৪৬৬০, ০১৭৩২-১৬৩১৫৭।
ই-মেইল: news@ghatanaprobaha.com, ওয়েবঃ- www.ghatanaprobaha.com
Developed By: Ekushey.Info